আজব আয়না মহল মণি গভীরে
(৪২)
আজব আয়না মহল মণি গভীরে।
সেথায় সতত বিরাজে
সাঁইজী মেরে ৼ
পূর্বদিকে রত্নবেদী
তার উপরে খেলছে
জ্যোতি
যে দেখেছে ভাগ্যপতি
সে সচেতন সব
খবরে ৼ
জলের ভিতর শুকনা
জমি
আঠার মোকামে
তাই কায়েমী
নিঃশব্দে শব্দের
উদগামী
সে মোকামের
খবর জান গা যারে ৼ
মণিপুরের হাটে
মনোহারী কল
তেহাটা ত্রিপেণী
তাহে বাঁকা নল
মাকড়ার আশে
বন্দী সে জল
লালন বলে ছন্দি
বুঝবে কেরে ৼ
প্রথম স্তবক: আজব আয়না মহল ও
সাঁইজীর বিরাজ
"আজব
আয়না মহল মণি
গভীরে। সেথায় সতত বিরাজে সাঁইজী মেরে ৼ"
- আজব আয়না মহল মণি: এক আশ্চর্য
আয়নার প্রাসাদ বা মহল (মানবদেহ
বা সূক্ষ্ম জগৎ) যা মণিময় (মূল্যবান ও উজ্জ্বল) এবং গভীরে (দেহের
গভীরে বা চেতনার গভীরে) অবস্থিত। 'আয়না মহল' মানে
যেখানে সবকিছুর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, অর্থাৎ আত্ম-উপলব্ধির স্থান।
- সেথায় সতত বিরাজে: সেই স্থানে সর্বদা বিরাজ
করেন।
- সাঁইজী মেরে: সাঁইজী (পরমাত্মা
বা ঈশ্বর)
মেরে (অর্থাৎ নিহিত হয়ে বা
অবস্থান করে)। এখানে 'মেরে' শব্দটি 'ভিতরে'
বা 'আবিষ্ট হয়ে' অর্থে
ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবক: রত্নবেদী ও
দিব্য জ্যোতি
"পূর্বদিকে
রত্নবেদী
তার উপরে খেলছে জ্যোতি যে
দেখেছে ভাগ্যপতি সে সচেতন সব খবরে ৼ"
- পূর্বদিকে রত্নবেদী: সেই 'আয়না
মহলের' পূর্বদিকে
(জ্ঞানের দিক, বা দেহের অভ্যন্তরের
নির্দিষ্ট স্থান) একটি রত্নবেদী (মূল্যবান
রত্নখচিত বেদি বা সিংহাসন) আছে। এটি হয়তো কোনো চক্র বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে
নির্দেশ করে।
- তার উপরে খেলছে জ্যোতি: সেই রত্নবেদীর উপরে জ্যোতি
(দিব্য আলোক বা জ্ঞান) খেলা করছে বা প্রকাশিত হচ্ছে।
- যে দেখেছে ভাগ্যপতি: যে ব্যক্তি এই জ্যোতি দর্শন
করতে পেরেছে, সে অত্যন্ত ভাগ্যবান (ভাগ্যপতি)।
- সে সচেতন সব খবরে: সে (সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি) সব খবরে
(সমস্ত জ্ঞান বা রহস্য সম্পর্কে) সচেতন বা অবগত।
তৃতীয়
স্তবক: জলের ভিতর শুকনা জমি ও শব্দের উদগামী
"জলের
ভিতর শুকনা জমি
আঠার মোকামে তাই কায়েমী নিঃশব্দে
শব্দের উদগামী
সে মোকামের খবর জান গা যারে ৼ"
- জলের ভিতর শুকনা জমি: এটি একটি গভীর রূপক। 'জল' বলতে
হয়তো মায়া, মোহ বা জাগতিক অস্তিত্বের সমুদ্রকে বোঝানো হয়েছে। তার ভেতরেই 'শুকনা
জমি' (অর্থাৎ,
শুকনো বা মায়ামুক্ত স্থান, আত্মিক
আশ্রয়) বিদ্যমান।
- আঠার মোকামে তাই কায়েমী: এই 'শুকনা
জমি' আঠারোটি মোকামে (স্থান বা স্তর) কায়েমী (স্থায়ীভাবে
প্রতিষ্ঠিত)। 'আঠারো মোকাম'
বাউল বা সুফি সাধনার বিভিন্ন স্তর বা দেহের ভেতরের
১৮টি বিশেষ স্থানকে নির্দেশ করে।
- নিঃশব্দে শব্দের উদগামী: সেই স্থানে নিঃশব্দে
(নীরবে, বাহ্যিক শব্দ ছাড়া) শব্দের উদগামী
(শব্দের উৎপত্তি বা প্রকাশ) হয়। এটি অনাদি শব্দ বা নাদব্রহ্ম এর ধারণাকে নির্দেশ করে, যা সৃষ্টির মূল ধ্বনি।
- সে মোকামের খবর জান গা যারে: সেই
মোকামের (স্থান বা স্তরের) খবর বা রহস্য সেই ব্যক্তিই জানতে পারে যে (এই
বিষয়ে অভিজ্ঞ)।
চতুর্থ স্তবক: মণিপুরের হাট ও
বাঁকা নল
"মণিপুরের
হাটে মনোহারী কল তেহাটা ত্রিপেণী তাহে বাঁকা নল মাকড়ার
আশে বন্দী সে জল লালন বলে ছন্দি বুঝবে কেরে ৼ"
- মণিপুরের হাটে: মণিপুর চক্রের (যোগশাস্ত্রের
তৃতীয় চক্র, নাভির কাছে অবস্থিত) হাটে (বাজার বা মিলনস্থল)।
- মনোহরী কল: একটি মনোহরী
(মনোরম, আকর্ষণীয়) কল (যন্ত্র বা কৌশল) রয়েছে।
- তেহাটা ত্রিপেণী তাহে বাঁকা নল: সেই
স্থানে
তেহাটা (ত্রিমুখী পথ) এবং ত্রিপেণী
(ত্রিবেণী, ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না
নাড়ীর মিলনস্থল) রয়েছে, আর তার মধ্যে বাঁকা
নল (সুষুম্না নাড়ী বা কুণ্ডলিনী শক্তির পথ) রয়েছে।
- মাকড়ার আশে বন্দী সে জল: 'মাকড়া' (মাকড়সা বা এর জাল) হলো মায়া বা জাগতিক বন্ধনের প্রতীক। সেই মায়ার
জালে 'জল' (জীবনশক্তি,
শুক্র, বা অমৃতরস) বন্দী হয়ে আছে।
- লালন বলে ছন্দি বুঝবে কেরে: লালন ফকির বলেন, এই ছন্দি
(গভীর রহস্য বা কৌশল) কে বুঝতে পারবে? (এটি এই সাধনার দুরূহতা এবং গোপনীয়তা নির্দেশ করে)।
মূল বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির মানবদেহকে এক অলৌকিক 'আয়না মহল' হিসেবে
বর্ণনা করেছেন, যেখানে পরমাত্মা (সাঁই) বিরাজ করেন। তিনি যোগিক সাধন পদ্ধতির মাধ্যমে দেহের
অভ্যন্তরে অবস্থিত চক্র,
নাড়ী এবং সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে সেই দিব্য জ্যোতি
এবং অনাদি শব্দকে উপলব্ধির কথা বলেছেন। একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই
রহস্যময় সাধনার পথটি অত্যন্ত জটিল এবং তা কেবল গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরাই
উপলব্ধি করতে পারে।