আজগুবী বৈরাগ্য লীলা দেখতে পাই
(৪৩)
আজগুবী বৈরাগ্য
লীলা দেখতে পাই।
হাত বানানো
চুল দাড়ি জট
কোন ভাবের ভাবুক
রে ভাই ৼ
যাত্রার দলেতে
দেখি
বেশ করিয়ে হয়
রে যোগী
তেমন কত জাল
বৈরাগী
বাসায় গেলে
কিছুই নাই ৼ
ফকির ও বৈষ্ণবের
তরে
ভক্তিকে ভর্ৎসনা
করে
এরা কী বুঝে
বেহাল পরে
বললে কিছু শুনতে
চাই ৼ
না জানি এই
কলির শেষে
আর কত রং উঠবে
দেশে
লালন ভেড়োর
দিন দিয়েছে
যে বাঁচো সে
দেখবে ভাই ৼ
প্রথম স্তবক: আজগুবি বৈরাগ্য
লীলা
"আজগুবী বৈরাগ্য লীলা দেখতে পাই। হাত
বানানো চুল দাড়ি জট কোন ভাবের ভাবুক রে ভাই
ৼ"
- আজগুবী বৈরাগ্য লীলা দেখতে পাই: আমি এক আজগুবি (অদ্ভুত, অলৌকিক বা অবিশ্বাস্য) বৈরাগ্য লীলা (সন্ন্যাসীদের
ভান বা আচরণ) দেখতে পাচ্ছি। এখানে 'বৈরাগ্য
লীলা' বলতে ভণ্ড সাধুদের লোক
দেখানো ভণ্ডামি বোঝানো হয়েছে।
- হাত বানানো চুল দাড়ি জট: (এরা) হাত বানানো (কৃত্রিম, সাজানো) চুল, দাড়ি ও জটা ধারণ করে। এটি
বাহ্যিক বেশভূষায় ভণ্ডামির ইঙ্গিত।
- কোন ভাবের ভাবুক রে ভাই: (আমি
জিজ্ঞাসা করি) হে ভাই, এরা কোন ভাবের (কোনো
প্রকৃত অনুভূতি বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির) দ্বারা চালিত ভাবুক (সাধক
বা চিন্তাশীল ব্যক্তি)? এই
প্রশ্নটি তাদের ভণ্ডামির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে।
দ্বিতীয় স্তবক: জাল বৈরাগীর
স্বরূপ
"যাত্রার দলেতে দেখি বেশ
করিয়ে হয় রে যোগী তেমন কত জাল বৈরাগী বাসায় গেলে কিছুই নাই ৼ"
- যাত্রার দলেতে দেখি: (এদেরকে)
যাত্রার দলের (যেখানে অভিনেতারা বিভিন্ন চরিত্র ধারণ করে) মতো দেখা যায়।
- বেশ করিয়ে হয় রে যোগী: তারা (শুধুমাত্র) বেশ
করিয়ে (পোশাক পরে বা অভিনয় করে)
যোগী (সন্ন্যাসী বা সাধক) হয়।
- তেমন কত জাল বৈরাগী: এমন
কত জাল বৈরাগী (ভণ্ড সন্ন্যাসী) রয়েছে।
- বাসায় গেলে কিছুই নাই: (কিন্তু)
তাদের নিজেদের বাসস্থানে বা প্রকৃত জীবনে গেলে (তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার)
কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি তাদের প্রতারণামূলক জীবনযাপনকে ইঙ্গিত করে।
তৃতীয় স্তবক: প্রকৃত ভক্তির
প্রতি অবজ্ঞা
"ফকির ও বৈষ্ণবের তরে ভক্তিকে
ভর্ৎসনা করে এরা কী বুঝে বেহাল পরে বললে কিছু শুনতে চাই ৼ"
- ফকির ও বৈষ্ণবের তরে: ফকির
(সুফি সাধক) এবং বৈষ্ণবদের (যারা বিষ্ণু বা চৈতন্যদেবের উপাসনা করে) জন্য।
- ভক্তিকে ভর্ৎসনা করে: (এই
ভণ্ডরা) ভক্তিকে (প্রকৃত নিষ্ঠা ও ঈশ্বর প্রেমকে) ভর্ৎসনা করে (তিরস্কার করে বা অবজ্ঞা
করে)।
- এরা কী বুঝে বেহাল পরে: এরা কী বোঝে যে, পরে
তাদের বেহাল (দুর্দশাগ্রস্ত বা খারাপ অবস্থা) হবে?
- বললে কিছু শুনতে চাই: (এরা)
কিছু (উপদেশ) বললে শুনতে চায় না। (অর্থাৎ, এরা প্রকৃত পথ থেকে বিচ্যুত এবং তাদের পরিণতি ভালো হবে না)।
চতুর্থ স্তবক: কলিযুগের শেষ ও
ভবিষ্যদ্বাণী
"না জানি এই কলির শেষে আর কত
রং উঠবে দেশে লালন ভেড়োর দিন দিয়েছে যে বাঁচো সে দেখবে ভাই ৼ"
- না জানি এই কলির শেষে: আমি
জানি না এই কলিযুগের (হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী বর্তমান অধর্ম ও কলহের যুগ) শেষে।
- আর কত রং উঠবে দেশে: (মানুষের)
দেশে আর কত রকম (ভণ্ডামি, ভান
বা মিথ্যা) রং (পরিচয় বা রূপ) প্রকাশিত হবে।
- লালন ভেড়োর দিন দিয়েছে: লালন ফকির (নিজেকে বিনয়ের সাথে 'ভেড়োর' বা নির্বোধ বলে) বলছেন, সময়
চলে যাচ্ছে।
- যে বাঁচো সে দেখবে ভাই: যে ব্যক্তি (এই সময় পার করে) বেঁচে থাকবে, সে এই সব (ভণ্ডামি ও পরিবর্তন) দেখতে পাবে, হে ভাই। এটি বর্তমান সময়ের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতি লালনের আক্ষেপ এবং
এক ধরণের ভবিষ্যদ্বাণী।
মূল বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির সমাজের ভণ্ড সাধু, ফকির ও বৈরাগী সেজে লোক
দেখানো আধ্যাত্মিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, বাহ্যিক বেশভূষা বা অভিনয় করে কেউ প্রকৃত সাধক হতে পারে না, কারণ তাদের মধ্যে প্রকৃত ভক্তি ও জ্ঞান থাকে না। এই ভণ্ডামিই তাদের এবং
সমাজের পতন ডেকে আনছে বলে লালন আক্ষেপ করেছেন।