আজব এক রসিক নাগর ভাসছে রসে
(৪১)
আজব এক রসিক
নাগর ভাসছে রসে।
হস্তপদ নাই
রে তার
বেগে ধায় সে
ৼ
সেই রসের সরোবর
তিলে তিলে হয়
সাঁতার
উজান ভেটেন
কলকাঠি তার
ঘুরায় বসে ৼ
ডুবলেরে দেল
দরিয়ায়
সে রসে নিলে
জানা যায়
মানবজনম সফল
হয়
তার পরশে ৼ
তার বামে কুলকুন্ডলিনী
যোগমায়া যাবে
বলি
লালন কয় স্মরণ
নিলি
যায় স্বদেশে
ৼ
প্রথম স্তবক: রসিক নাগর ও তার
গতি
"আজব এক রসিক নাগর ভাসছে রসে। হস্তপদ
নাই রে তার বেগে ধায় সে ৼ"
- আজব এক রসিক নাগর: এক
আশ্চর্য বা অলৌকিক রসিক
নাগর (প্রেমিক বা আনন্দময়
সত্তা)। এটি পরমাত্মা, বা সেই প্রাণশক্তি যা দেহের
ভেতর আনন্দের উৎস।
- ভাসছে রসে: সে
(সেই রসিক নাগর) এক বিশেষ রসে (আনন্দ, প্রেম বা জীবনীশক্তি) ভাসছে
বা নিমজ্জিত হয়ে আছে।
- হস্তপদ নাই রে তার: তার
কোনো হাত বা পা নেই। এটি সেই সত্তার নিরাকার বা অশরীরী রূপকে বোঝায়, যা স্থূল দেহের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে।
- বেগে ধায় সে: তবুও
সে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে (বেগে) ধাবিত হয় বা কার্যকর থাকে। এটি তার অলৌকিক
ক্ষমতা এবং সক্রিয়তা বোঝায়।
দ্বিতীয় স্তবক: রসের সরোবর ও
যোগিক ক্রিয়া
"সেই রসের সরোবর তিলে
তিলে হয় সাঁতার উজান ভেটেন কলকাঠি তার ঘুরায় বসে ৼ"
- সেই রসের সরোবর: সেই রস বা
শক্তির এক বিশাল সরোবর (হ্রদ বা উৎস)। এটি মানবদেহের ভেতরের সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তিকে বোঝাতে
পারে।
- তিলে তিলে হয় সাঁতার: সেই
সরোবরে তিলে তিলে (ধীরে ধীরে, বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে)
সাঁতার কাটতে হয় বা অনুশীলন করতে হয়।
- উজান ভেটেন কলকাঠি তার: সে (রসিক নাগর) উজান (উপরের দিকে) এবং ভেটেন (নিচের দিকে) গতির কলকাঠি (নিয়ন্ত্রণ দণ্ড) ঘোরায়। এটি যোগিক প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত, যেখানে প্রাণশক্তিকে দেহের বিভিন্ন চক্রে ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী করে
নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
- ঘুরায় বসে: স্থির
হয়ে বসে (ধ্যান বা সাধনারত অবস্থায়) এই কলকাঠি ঘুরানো হয়।
তৃতীয়
স্তবক: আত্ম-উপলব্ধি ও মানবজন্মের সার্থকতা
"ডুবলেরে দেল দরিয়ায় সে রসে
নিলে জানা যায় মানবজনম সফল হয় তার পরশে ৼ"
- ডুবলেরে দেল দরিয়ায়: হে
মন, তুমি দেল দরিয়ায় (হৃদয় সমুদ্রে) ডুব দাও।
অর্থাৎ, নিজের অন্তরে গভীরভাবে
প্রবেশ করো।
- সে রসে নিলে জানা যায়: সেই (আভ্যন্তরীণ) রসে (আনন্দ বা জীবনীশক্তিতে) ডুব দিলে বা তা অনুভব করলে সেই রসিক নাগরকে
জানা যায়।
- মানবজনম সফল হয়: তার
(রসিক নাগরের) পরশে (স্পর্শে বা উপলব্ধির মাধ্যমে) মানবজন্ম সার্থক হয়।
চতুর্থ স্তবক: কুলকুণ্ডলিনী ও
স্বদেশে গমন
"তার বামে কুলকুন্ডলিনী যোগমায়া
যাবে বলি লালন কয় স্মরণ নিলি যায় স্বদেশে ৼ"
- তার বামে কুলকুন্ডলিনী: সেই রসিক নাগরের বামে কুলকুণ্ডলিনী (মানবদেহের মূলাধার চক্রে সুপ্ত এক যোগিক শক্তি)। এটি প্রাণশক্তির উৎস।
- যোগমায়া যাবে বলি: (যদি
কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়) তাহলে যোগমায়া (মায়ার বন্ধন) বলি হয়ে
যাবে বা বিনাশ হবে।
- লালন কয় স্মরণ নিলি: লালন
ফকির বলেন, যদি তাকে (রসিক নাগরকে)
স্মরণ করা হয় বা তার শরণাপন্ন হওয়া যায়।
- যায় স্বদেশে: তাহলে
নিজের স্বদেশে (প্রকৃত আত্মস্বরূপে বা পরমধামে) ফিরে যাওয়া যায়। অর্থাৎ, মুক্তি লাভ করা যায়।
মূল বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির মানবদেহের অভ্যন্তরে বিরাজমান এক শক্তিধর, নিরাকার 'রসিক নাগর' (পরমাত্মা বা জীবনীশক্তি) এর কথা
বলেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই রহস্যময় সত্তাকে
উপলব্ধি করার জন্য অন্তর্মুখী সাধনা প্রয়োজন। কুলকুণ্ডলিনী জাগরণ এবং যোগ সাধনার
মাধ্যমে এই 'রস' উপলব্ধি করলে মায়ার বন্ধন ছিন্ন হয় এবং মানুষ তার প্রকৃত আত্মস্বরূপে
ফিরে আসে।