আপন মনে দেখ মনরায় ঝরার খালে বাঁধ বাঁধিলে
(৬১)
আপন মনে দেখ
মনরায়
ঝরার খালে বাঁধ
বাঁধিলে
গুরু রূপের
ঝলক দেয় ৼ
পূর্ব দিকে
রত্নবেদী
দাড়িম্ব পুষ্পের
জ্যোতি
তাহার রূপাকৃতি,
বিদ্যুৎ চটকের
ন্যায় ৼ
যেরূপ আশ্রিত
মাঝে
গোলক সাগর ভাসে
তাহার দক্ষিণ
পাশে
কিশোর কিশোরী
রয় ৼ
স্বরূপ আশ্রিত
যারা
সব খবরের জবর
তারা
লালন বলে জেন্দা
মরা
থাকগা ত্রিবেণী
সদায় ৼ
প্রথম
স্তবক: গুরুকৃপা ও ঝরার খাল
"আপন মনে দেখ মনরায় ঝরার খালে বাঁধ বাঁধিলে গুরু রূপের ঝলক দেয় ৼ"
- আপন মনে দেখ: (হে সাধক) নিজের মনে (অন্তরের
দিকে) দেখো।
- মনরায়: হে মনরায় (মনরূপী
রাজা, অর্থাৎ হে মন)।
- ঝরার খালে: ঝরার
খাল (যে পথে দেহের রস ক্ষরিত হয় বা জীবনীশক্তি ব্যয়
হয়, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়পথ)।
- বাঁধ বাঁধিলে: যদি
সেই খালে বাঁধ বাঁধতে পারো (অর্থাৎ ইন্দ্রিয় সংযম করতে পারো বা
জীবনীশক্তিকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারো)।
- গুরু রূপের: (তাহলে) গুরুর রূপের (গুরুর
জ্যোতির্ময় রূপ বা ঐশ্বরিক প্রকাশের)।
- ঝলক দেয়: ঝলক
দেখা যায় বা প্রকাশ পায়। মূলভাব: যদি মনকে সংযত করে ইন্দ্রিয় সুখের প্রবাহ বন্ধ করা
যায়, তবে গুরুর কৃপায় বা পরম
সত্তার জ্যোতির্ময় রূপের ঝলক দেখা যায়।
দ্বিতীয়
স্তবক: রত্নবেদী ও দিব্য জ্যোতি
"পূর্ব দিকে রত্নবেদী দাড়িম্ব পুষ্পের জ্যোতি তাহার রূপাকৃতি, বিদ্যুৎ চটকের ন্যায় ৼ"
- পূর্ব দিকে: (দেহের অভ্যন্তরের) পূর্ব দিকে (আধ্যাত্মিক
জ্ঞানের দিকে বা নির্দিষ্ট কোনো চক্রে)।
- রত্নবেদী: একটি রত্নবেদী (মূল্যবান
রত্নখচিত বেদি বা সিংহাসন) আছে। এটি সম্ভবত মূলাধার বা স্বাধিষ্ঠান চক্রের
প্রতীক।
- দাড়িম্ব পুষ্পের: দাড়িম্ব (ডালিম) পুষ্পের মতো।
- জ্যোতি: জ্যোতি
(উজ্জ্বলতা বা লালচে আভা)।
- তাহার রূপাকৃতি: তার
(সেই রত্নবেদীতে প্রকাশিত রূপের) রূপাকৃতি (আকার বা প্রকৃতি)।
- বিদ্যুৎ চটকের: বিদ্যুৎ
চটকের (বিদ্যুতের ঝলকানির) মতো।
- ন্যায়: ন্যায়
(মতো)। মূলভাব: দেহের অভ্যন্তরে এমন এক রত্নবেদী আছে, যেখানে ডালিম ফুলের মতো উজ্জ্বল এক দিব্য জ্যোতি প্রকাশিত হয়, যা বিদ্যুতের ঝলকের মতো চমকপ্রদ।
তৃতীয়
স্তবক: গোলক সাগর ও কিশোর-কিশোরী
"যেরূপ আশ্রিত মাঝে গোলক সাগর ভাসে তাহার দক্ষিণ পাশে কিশোর কিশোরী রয়
ৼ"
- যেরূপ আশ্রিত: যে
রূপকে (সৃষ্টিকর্তার রূপকে) আশ্রয় করে।
- মাঝে: তার
মাঝে।
- গোলক সাগর ভাসে: গোলক
সাগর (কৃষ্ণধাম গোলক বা
আধ্যাত্মিক আনন্দের সাগর) ভেসে আছে বা বিদ্যমান।
- তাহার দক্ষিণ পাশে: তার
(সেই গোলক সাগরের) দক্ষিণ
পাশে (শুভ বা অনুকূল দিকে)।
- কিশোর কিশোরী: কিশোর-কিশোরী (শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা; এখানে
পরমাত্মা ও প্রকৃতি অথবা যুগল রূপের প্রতীক)।
- রয়: অবস্থান
করেন। মূলভাব: সেই দিব্য রূপের মাঝেই গোলক সাগর এবং তার দক্ষিণে
কিশোর-কিশোরী (পরম সত্তা) অবস্থান করেন, যা
দিব্যপ্রেম ও আনন্দের প্রতীক।
চতুর্থ
স্তবক: স্বরূপ আশ্রিত ও ত্রিবেণীতে অবস্থান
"স্বরূপ আশ্রিত যারা সব খবরের জবর তারা লালন বলে জেন্দা মরা থাকগা ত্রিবেণী সদায় ৼ"
- স্বরূপ আশ্রিত: যারা স্বরূপকে (নিজের
প্রকৃত আত্মাকে বা পরম সত্তার রূপকে) আশ্রয় করে থাকে।
- যারা: তারা।
- সব খবরের জবর: তারা সব খবরের (সমস্ত
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের) জবর (প্রভু, অর্থাৎ সব জানে)।
- তারা: তারা।
- লালন বলে জেন্দা মরা: লালন
ফকির বলেন, (তারা) জ্যান্তে মরা (জীবিত
থেকেও জাগতিক বিষয় থেকে বিরাগী বা মৃত)।
- থাকগা ত্রিবেণী: (হে
সাধক, তুমি) ত্রিবেণীতে (ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নাড়ীর মিলনস্থলে, যোগিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র) অবস্থান করো।
- সদায়: সর্বদা। মূলভাব: যারা নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে, তারাই সকল আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করে। তারা জীবদ্দশায়ই জাগতিক বিষয়ে
উদাসীন থাকে। লালন উপদেশ দিচ্ছেন, এই
জ্ঞান লাভের জন্য সর্বদা ত্রিবেণীতে মন নিবদ্ধ রাখতে হবে।
মূল
বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির ইন্দ্রিয় সংযম (ঝরার খালে বাঁধ
বাঁধা), গুরুকৃপা, এবং আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে মানবদেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত দিব্য শক্তি ও পরম সত্তা (কিশোর-কিশোরী) উপলব্ধির কথা বলেছেন। তিনি জোর দিয়েছেন যে, যারা এই
আত্মিক স্বরূপকে জানতে পারে, তারাই প্রকৃত জ্ঞানী হয়
এবং তারা জীবদ্দশায়ই জাগতিক মোহের প্রতি উদাসীন (জেন্দা মরা) হয়ে থাকে। এই জ্ঞান
লাভের জন্য ত্রিবেণী সহ যোগিক কেন্দ্রগুলিতে মনোনিবেশ করা অপরিহার্য।