আমার আপন খবর নাহি রে কেবল বাউল নাম ধরি
(৭৬)
আমার আপন খবর
নাহি রে
কেবল বাউল নাম
ধরি।
বেদ-বেদান্তে
নাই যার উল,
শুধু কেবল নামে
মশগুল
জগৎ ভরি ৼ
খবরদার কারে
বলা যায়
কিসে হয় খবরদারি;
আপনার আপনি
জেনেছে
বাউলের উল সেই
পেয়েছে
সে হুঁসারি
ৼ
কত মুনি-ঋষি
যোগী-ন্যাসী
খবর পায় না তারি;
আউল বাউলের
আপ্ততত্ত্বে ভজন
আমি লালন পশুর
চলন
কেমনে ত্বরি
ৼ
প্রথম স্তবক: নামসর্বস্ব বাউল ও
আত্মজ্ঞানের অভাব
"আমার
আপন খবর নাহি রে কেবল বাউল নাম ধরি। বেদ-বেদান্তে নাই যার
উল, শুধু কেবল নামে মশগুল জগৎ ভরি ৼ"
- আমার
আপন খবর: আমার আপন খবর (নিজের
প্রকৃত আত্মস্বরূপের জ্ঞান)।
- নাহি
রে: নেই, হে।
- কেবল
বাউল নাম ধরি: আমি
কেবল বাউল নাম ধারণ করি (অর্থাৎ, আমি নামেই বাউল, কাজে
নই)।
- বেদ-বেদান্তে
নাই যার উল: যার
(পরম সত্তার) উল (সূত্র বা সন্ধান) বেদ-বেদান্তেও নেই।
- শুধু
কেবল নামে মশগুল: (আমি) শুধু সেই সত্তার নামে মশগুল (মগ্ন
বা ব্যস্ত)।
- জগৎ
ভরি: জগৎ ভরে (অর্থাৎ, সবাই নামসর্বস্ব সাধনায় মগ্ন)। মূলভাব: লালন
বলছেন, তাঁর নিজের আত্মজ্ঞান নেই, অথচ তিনি বাউল নাম ধারণ করে আছেন। যে পরম সত্তার খোঁজ বেদ-বেদান্তেও
মেলে না, সেই সত্তার নাম জপ করে তিনি
এবং অন্য সবাই শুধু সময় নষ্ট করছেন।
দ্বিতীয় স্তবক: খবরদারী ও
হুঁশিয়ারী
"খবরদার
কারে বলা যায় কিসে হয় খবরদারি; আপনার
আপনি জেনেছে বাউলের উল সেই পেয়েছে সে হুঁসারিৼ"
- খবরদার
কারে: খবরদার (যিনি খবর রাখেন, তত্ত্বজ্ঞানী)
কাকে।
- বলা
যায়: বলা যায়?
- কিসে
হয় খবরদারি: কীভাবে খবরদারি (তত্ত্বজ্ঞানী হওয়া) হয়?
- আপনার
আপনি জেনেছে: যে
ব্যক্তি আপনার আপনি (নিজেকে) জেনেছে।
- বাউলের
উল সেই পেয়েছে: সেই
ব্যক্তিই বাউলের উল (বাউল সাধনার মূল সূত্র) পেয়েছে।
- সে
হুঁসারি: সেই ব্যক্তিই হুঁশিয়ার (সচেতন
বা জ্ঞানী)। মূলভাব: লালন বলছেন, তত্ত্বজ্ঞানী
সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে চিনেছে। কেবল
নিজেকে জানলেই বাউল সাধনার মূল রহস্য বোঝা যায় এবং সেই ব্যক্তিই সচেতন হতে
পারে।
তৃতীয় স্তবক: পশুর চলন ও মুক্তি
লাভের আক্ষেপ
"কত
মুনি-ঋষি যোগী-ন্যাসী খবর পায় না তারি; আউল
বাউলের আপ্ততত্ত্বে ভজন আমি লালন পশুর চলন কেমনে ত্বরিৼ"
- কত
মুনি-ঋষি যোগী-ন্যাসী: কত মুনি-ঋষি, যোগী-সন্ন্যাসী (ন্যাসী)।
- খবর
পায় না তারি: তাঁর
(পরম সত্তার) খবর (সন্ধান) পায় না।
- আউল
বাউলের: আউল-বাউলের (প্রকৃত সাধকদের)।
- আপ্ততত্ত্বে
ভজন: আপ্ততত্ত্বে (আত্মতত্ত্বের বা আত্মজ্ঞানের ওপর) ভজন (সাধনা)।
- আমি
লালন পশুর চলন: কিন্তু
আমি লালন একজন পশুর চলন (পশুর মতো অজ্ঞানভাবে
জীবনযাপন) করি।
- কেমনে
ত্বরি: কীভাবে ত্বরাব (উদ্ধার
পাব)? মূলভাব: অনেক মুনি-ঋষিও পরম সত্তার সন্ধান পান না। প্রকৃত
আউল-বাউলেরা আত্মতত্ত্বের সাধনা করেন, কিন্তু
লালন নিজেকে পশুর মতো অজ্ঞানী মনে করছেন এবং আক্ষেপ করছেন যে, তিনি কীভাবে মুক্তি লাভ করবেন।
মূল বার্তা:
এই গানে লালন ফকির আত্মানুসন্ধানের ওপর চরম গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, কেবল 'বাউল' নাম ধারণ করলেই চলে না, বরং নিজের ভেতরের 'আপন খবর' জানতে হয়। যারা নিজেকে জানে, তারাই
প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী। লালন নিজেকে একজন নামসর্বস্ব বাউল হিসেবে চিহ্নিত করে আক্ষেপ
করেছেন যে, তিনি আত্মতত্ত্বের গভীর সাধনা না
করে পশুর মতো জীবনযাপন করছেন। তাই তিনি প্রশ্ন করছেন, তার মতো একজন ব্যক্তির মুক্তি কীভাবে সম্ভব।
