আঁচলা ঝুলা তিলক মালা মাটির ভাঁড় দিবে হাতে
(৩০)
আঁচলা ঝুলা
তিলক মালা
মাটির ভাঁড়
দিবে হাতে।
গৌর কলঙ্কিনী
ধনি
হসনে লো কোনো
মতে ৼ
মোটা মোটা মালা
গলে
তিলক-চন্দন
তার কপালে
থাকতে হবে গাছের
তলে
মালাতে হবে
জল খেতে ৼ
বৃন্দাবনের
নাড়া-নাড়ী
বেড়ায় ব্রজের
বাড়ি-বাড়ি
তারা যোগাড়
করে সেবার কাড়ি
শাক-চচ্চড়ি
ওল ভাতে ৼ
গৌর প্রেমের
করে আশা
দেখে যা আমাদের
দশা
ঘর ছেড়ে জঙ্গলে
বাসা
কামড়ায় মশা
মাছিতে ৼ
গৌর প্রেম এমনি
ধরণ
ব্রজ গোপির
অকৈতব করণ
সিরাজ সাঁইয়ের
চরণ ভুলে রে লালন
বেড়াই অকুলেতে
ৼ
প্রথম স্তবক: গৌর প্রেমের আহ্বান
"আঁচলা
ঝুলা তিলক মালা
মাটির ভাঁড় দিবে হাতে। গৌর
কলঙ্কিনী ধনি
হসনে লো কোনো মতে ৼ"
- আঁচলা ঝুলা তিলক মালা: এই কথাগুলো একজন বৈষ্ণব
সাধকের বাহ্যিক বেশভূষার বর্ণনা দেয়। 'আঁচলা' বা
ঝুলি হলো ভিক্ষাপাত্র বা কম্বলের ঝোলা; 'ঝুলা' ভিক্ষার
ঝুলি; 'তিলক' কপালে আঁকা বৈষ্ণব চিহ্ন; এবং 'মালা' তুলসীর
মালা।
- মাটির ভাঁড় দিবে হাতে: হাতে মাটির জলপাত্র
বা ভিক্ষাপাত্র নিতে হবে। এটি বৈরাগ্য এবং নির্ভরতার প্রতীক।
- গৌর কলঙ্কিনী ধনি: হে ধনী, তুমি গৌর কলঙ্কিনী
(গৌর প্রেমের জন্য কলঙ্কিনী) হও। এখানে 'কলঙ্কিনী' শব্দটি
সাধারণ অর্থে নেতিবাচক নয়, বরং সমাজের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হয়েও
গৌর প্রেমের জন্য আত্মত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তিতে রাধার
কৃষ্ণপ্রেমের জন্য সমাজের তিরস্কার ভোগ করাকে মহিমান্বিত করা হয়।
- হসনে লো কোনো মতে: তুমি কোনো অবস্থাতেই
(সমাজের নিন্দা শুনে) দ্বিধাগ্রস্ত বা লজ্জিত হয়ো না।
দ্বিতীয়
স্তবক: বৈষ্ণব সাধকের জীবন
"মোটা
মোটা মালা গলে
তিলক-চন্দন তার কপালে থাকতে
হবে গাছের তলে
মালাতে হবে জল খেতে ৼ"
- মোটা মোটা মালা গলে: গলায় তুলসী বা রুদ্রাক্ষের
মোটা মালা পরতে হবে।
- তিলক-চন্দন তার কপালে: কপালে তিলক ও চন্দনের ছাপ
থাকবে।
- থাকতে হবে গাছের তলে: গাছের নিচে আশ্রয় নিতে হবে, অর্থাৎ
কোনো নির্দিষ্ট ঘর বা বাসস্থান থাকবে না। এটি বৈরাগ্য এবং সন্ন্যাসবৃত্তির
প্রতীক।
- মালাতে হবে জল খেতে: (মালাধারী হয়ে) মালা থেকেই জল পান করতে
হবে, অর্থাৎ অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতে হবে।
তৃতীয় স্তবক: সেবাপরায়ণতা ও
কষ্ট
"বৃন্দাবনের
নাড়া-নাড়ী
বেড়ায় ব্রজের বাড়ি-বাড়ি তারা
যোগাড় করে সেবার কাড়ি শাক-চচ্চড়ি ওল ভাতে ৼ"
- বৃন্দাবনের নাড়া-নাড়ী: বৃন্দাবনের নাড়া
(পুরুষ বৈষ্ণব সন্ন্যাসী) ও নাড়ী (নারী
বৈষ্ণব সাধিকা)।
- বেড়ায় ব্রজের বাড়ি-বাড়ি: তারা
ব্রজধামের (কৃষ্ণের লীলাভূমি) বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়।
- তারা যোগাড় করে সেবার কাড়ি: তারা
(গুরুর বা ভগবানের) সেবার জন্য নানা রকম উপকরণ সংগ্রহ করে। 'কাড়ি' মানে
রাশি বা স্তূপ।
- শাক-চচ্চড়ি ওল ভাতে: শাক-চচ্চড়ি এবং ওল ভাতের
মতো সাধারণ খাবার। অর্থাৎ, তারা কোনো প্রকার ভোগবিলাস ছাড়াই কঠোর
জীবনযাপন করে এবং সামান্য নিরামিষ আহার গ্রহণ করে।
চতুর্থ স্তবক: প্রেমের জন্য
ত্যাগ ও কষ্ট
"গৌর
প্রেমের করে আশা দেখে যা আমাদের দশা ঘর
ছেড়ে জঙ্গলে বাসা কামড়ায় মশা মাছিতে ৼ"
- গৌর প্রেমের করে আশা: যারা গৌর প্রেমের আশা করে
বা তা পেতে চায়।
- দেখে যা আমাদের দশা: তারা আমাদের (অর্থাৎ বৈষ্ণব
সাধকদের) দশা বা অবস্থা দেখে যাক।
- ঘর ছেড়ে জঙ্গলে বাসা: ঘর-সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে
(নির্জন স্থানে) বসবাস করতে হয়।
- কামড়ায় মশা মাছিতে: সেখানে মশা-মাছির কামড়
সহ্য করতে হয়। এটি আধ্যাত্মিক পথের কষ্ট, ত্যাগ এবং জাগতিক আরাম
ত্যাগের ইঙ্গিত।
পঞ্চম স্তবক: গুরুর প্রতি সমর্পণ
"গৌর
প্রেম এমনি ধরণ
ব্রজ গোপির অকৈতব করণ সিরাজ
সাঁইয়ের চরণ ভুলে রে লালন বেড়াই অকুলেতে ৼ"
- গৌর প্রেম এমনি ধরণ: গৌর প্রেম এমনই প্রকৃতির।
- ব্রজ গোপির অকৈতব করণ: এটি ব্রজের গোপীদের মতো
অকৈতব (নিষ্কাম,
স্বার্থহীন) প্রেম বা সাধন। গোপীরা যেমন কোনো
প্রতিদানের আশা না করে কৃষ্ণকে ভালোবাসতেন, তেমনি গৌর প্রেমও
তেমনই নিঃস্বার্থ।
- সিরাজ সাঁইয়ের চরণ ভুলে রে লালন: (কিন্তু আক্ষেপ করে বলছেন)
হে লালন, আমি সিরাজ সাঁইয়ের (আমার গুরু) চরণ ভুলে।
- বেড়াই অকুলেতে: অকূল সমুদ্রে (অর্থাৎ
কূল-কিনারা বিহীন অবস্থায়, পথভ্রষ্ট হয়ে) ঘুরে বেড়াচ্ছি। এটি
নিজের অপূর্ণতা এবং গুরুকে ভুলে যাওয়ার কারণে পথভ্রষ্ট হওয়ার আক্ষেপ।
মূল বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির গৌর প্রেমের জন্য চরম ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি বৈষ্ণব
সাধকদের জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই পথে
বাহ্যিক আরাম বা সামাজিক সম্মানের কোনো স্থান নেই, কেবল নিঃস্বার্থ প্রেম এবং কষ্ট
স্বীকারের মাধ্যমেই সেই দিব্য প্রেম লাভ করা যায়। শেষ অংশে তিনি নিজের অপূর্ণতার
কথা বলে গুরুর গুরুত্বকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।