cover

cover

আপনার আপনি ফানা হলে সকল জানা যাবে

 


(৫২)

আপনার আপনি ফানা হলে

সকল জানা যাবে।

কোররূপে হলে ফানা

সে ভেদ জানতে পাবে

 

আরবিতে বলে আল্লা

পারশিতে কয় খোদাতালা

গড বলেছে যীশুর চেলা

ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভেবে

 

আল্লা হরি ভবজন পূজন

মানুষের সকল সৃজন

অচানক অচিনাই কখন

জ্ঞান ইন্দ্রিয় না সম্ভবে

 

মনের ভাব প্রকাশিতে

ভাষার সৃষ্টি এই জগতে

আচানকে অধরকে চিনতে

ভাষা বাক্যে নাহি পাবে

 

আপনার আপনি হলে ফানা

দেখা দেবেন সাঁই রব্বানা

সিরাজ সাঁই কয় লালন কানা

স্বরূপে রূপ দেখ সংক্ষেপে


প্রথম স্তবক: আত্ম-বিলীনতা ও জ্ঞান লাভ

"আপনার আপনি ফানা হলে সকল জানা যাবে। কোররূপে হলে ফানা সে ভেদ জানতে পাবে ৼ"

  • আপনার আপনি: নিজের (স্বতন্ত্র সত্তা) নিজেকেই
  • ফানা হলে: ফানা হলে (বিলীন হলে, অর্থাৎ আত্ম-অহংকার বা ব্যক্তিগত অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেললে)। এটি সুফি দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা
  • সকল জানা যাবে: (তাহলে) সকল সত্য বা জ্ঞান জানা যাবে
  • কোররূপে হলে: কোররূপে (মূল সত্তার রূপে বা নিরাকার রূপে) হলে
  • ফানা: বিলীন হলে
  • সে ভেদ জানতে: সেই ভেদ (রহস্য বা পার্থক্য) জানতে
  • পাবে: পারা যাবে। অর্থাৎ, নিজের অহংকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করলেই পরম সত্তার রহস্য জানা যায়

দ্বিতীয় স্তবক: ধর্মের ভিন্নতা ও মূল সত্তার একত্ব

"আরবিতে বলে আল্লা পারশিতে কয় খোদাতালা গড বলেছে যীশুর চেলা ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভেবে ৼ"

  • আরবিতে বলে আল্লা: আরবি ভাষায় (ঈশ্বরকে) আল্লা বলা হয়
  • পারশিতে কয় খোদাতালা: পারস্যে (ফারসি ভাষায়) তাঁকে খোদাতালা বলা হয়
  • গড বলেছে যীশুর চেলা: যীশুর শিষ্যরা (খ্রিস্টানরা) তাঁকে গড বলেছে
  • ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভেবে: বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে (মানুষ) ভিন্ন ভিন্নভাবে (ঈশ্বরকে) ভেবেছে বা নামকরণ করেছে। এটি বোঝায় যে, নাম বা ভাষার ভিন্নতা থাকলেও পরম সত্তা একই

তৃতীয় স্তবক: সকল সৃষ্টির উৎস ও জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা

"আল্লা হরি ভবজন পূজন মানুষের সকল সৃজন অচানক অচিনাই কখন জ্ঞান ইন্দ্রিয় না সম্ভবে ৼ"

  • আল্লা হরি ভবজন: আল্লা, হরি (ঈশ্বর) এবং ভবজন (জাগতিক মানুষ, বা মানুষের জীবন)। এই সবকিছুরই
  • পূজন: (আরাধনা বা) ভিত্তি
  • মানুষের সকল সৃজন: মানুষের সকল সৃষ্টি (অর্থাৎ, যা কিছু মানুষ সৃষ্টি করে বা মানুষ নিজেই)
  • অচানক অচিনাই: (তার) অচেনা বা অজানা এক কারণ
  • কখন: যেটিকে
  • জ্ঞান ইন্দ্রিয় না সম্ভবে: (আমাদের) জ্ঞান বা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, পরম সত্তা সকল মানুষের সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু তিনি আমাদের ইন্দ্রিয়ের গোচরীভূত নন

চতুর্থ স্তবক: ভাষা ও উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা

"মনের ভাব প্রকাশিতে ভাষার সৃষ্টি এই জগতে আচানকে অধরকে চিনতে ভাষা বাক্যে নাহি পাবে ৼ"

  • মনের ভাব প্রকাশিতে: মনের ভাব (অনুভূতি বা চিন্তা) প্রকাশ করার জন্য
  • ভাষার সৃষ্টি: ভাষার সৃষ্টি হয়েছে
  • এই জগতে: এই পৃথিবীতে
  • আচানকে অধরকে চিনতে: কিন্তু সেই আচানক (আশ্চর্যজনক, অলৌকিক) অধরকে (যাকে ধরা বা ছোঁয়া যায় না, পরম সত্তা) চিনতে
  • ভাষা বাক্যে নাহি পাবে: (কোনো) ভাষা বা বাক্য দ্বারা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ, পরম সত্তা ভাষার ঊর্ধ্বে, তাকে শুধু অনুভব করা যায়

পঞ্চম স্তবক: সাঁই রব্বানার দর্শন ও লালনের আক্ষেপ

"আপনার আপনি হলে ফানা দেখা দেবেন সাঁই রব্বানা সিরাজ সাঁই কয় লালন কানা স্বরূপে রূপ দেখ সংক্ষেপে ৼ"

  • আপনার আপনি হলে ফানা: নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করতে পারলে
  • দেখা দেবেন সাঁই রব্বানা: সাঁই রব্বানা (পরম প্রভু ঈশ্বর) দর্শন দেবেন
  • সিরাজ সাঁই কয় লালন কানা: (লালনের গুরু) সিরাজ সাঁই বলেন, হে লালন, তুমি তো কানা (অন্ধ, অজ্ঞ)
  • স্বরূপে রূপ দেখ সংক্ষেপে: (তাই) তুমি নিজেরই স্বরূপে (প্রকৃত আত্মসত্তায়) সেই রূপ (পরম সত্তার রূপ) সংক্ষেপে দেখো (উপলব্ধি করার চেষ্টা করো)। (এখানে গুরু লালনকে নিজের অজ্ঞানতা উপলব্ধি করিয়ে আত্মোপলব্ধির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।)

মূল বার্তা:

এই গানে লালন ফকির বলছেন যে, নিজের অহং বা পৃথক সত্তাকে বিলীন (ফানা) করতে পারলেই কেবল সকল সত্য ও পরম সত্তাকে জানা সম্ভব। তিনি দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বরকে মানুষ বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকলেও, সত্তাগতভাবে তিনি এক ও অভিন্ন। আমাদের ইন্দ্রিয় ও ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই নিরাকার পরম সত্তাকে বোঝা বা প্রকাশ করা কঠিন। লালনের গুরু সিরাজ সাঁই তাকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, এই সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে নিজের মধ্যেই সেই স্বরূপকে চিনতে হবে, কারণ নিজেকে জানলেই সকল জ্ঞানের দুয়ার খুলে যায়


Powered by Blogger.