cover

cover

আমি কি সাধনে পাই গো তারে

 


(৮২)

আমি কি সাধনে পাই গো তারে।

যার নাম অধর এই সংসারে

কত মুনি-ঋষি হদ্দ হলো ধ্যান করে

 

কেউ ফকির কেউ হচ্ছে যোগী

কেউ মহস্ত কেউ বৈরাগী

কার বা কথায় মন সুতায়

দিই গিরে

 

ব্রহ্মজ্ঞানী খ্রিস্টানেরা

নাম ব্রহ্মসার বলেন তারা

আবার দরবেশে কয় বস্তু কোথায়

দেখ না রে

 

গুরুতত্ত্ব বিধি শোনা যায়

তাও তো দেখি একরূপ সে নয়

লালন বলে যে যা বোঝে

তাই করে


প্রথম স্তবক: দুর্লভ আরাধ্য ও সাধনার প্রশ্ন

"আমি কি সাধনেপাই গো তারে।যার নাম অধরএই সংসারেকত মুনি-ঋষিহদ্দ হলো ধ্যান করে ৼ"

  • আমি কি সাধনে: আমি কোন সাধনায় (আধ্যাত্মিক অনুশীলন বা পদ্ধতিতে)
  • পাই গো তারে: তাকে (পরম সত্তাকে) পাব?
  • যার নাম অধর: যার নাম অধর (যাকে ধরা বা স্পর্শ করা যায় না)
  • এই সংসারে: এই জগতে
  • কত মুনি-ঋষি: কত মুনি-ঋষি (সাধক ও জ্ঞানী)
  • হদ্দ হলো: হদ্দ (ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত বা ব্যর্থ) হলো
  • ধ্যান করে: কেবল ধ্যান করে। মূলভাব: লালন আক্ষেপ করছেন যে, যে পরম সত্তাকে মুনি-ঋষিরাও ধ্যান করে খুঁজে পান না, তাকে তিনি কোন উপায়ে লাভ করবেন?

দ্বিতীয় স্তবক: ভিন্ন পথের ভিন্নতা ও মনের বিভ্রান্তি

"কেউ ফকির কেউহচ্ছে যোগীকেউ মহস্ত কেউবৈরাগীকার বা কথায়মন সুতায়দিই গিরে ৼ"

  • কেউ ফকির কেউ হচ্ছে যোগী: কেউ ফকির (সুফি সাধক) হচ্ছে, কেউ যোগী (যোগ সাধক) হচ্ছে
  • কেউ মহস্ত কেউ বৈরাগী: কেউ মহন্ত (গুরু বা প্রধান) হচ্ছে, কেউ বৈরাগী (সংসারত্যাগী) হচ্ছে
  • কার বা কথায়: (এখন) কার কথায়?
  • মন সুতায়: মনের সুতোয়
  • দিই গিরে: গিরে (গিঁট) দেবো? (অর্থাৎ, মনের সুতোয় কাকে বিশ্বাস করব?) মূলভাব: সাধনার এত ভিন্ন ভিন্ন পথ দেখে লালন বিভ্রান্ত। তিনি প্রশ্ন করছেন, কোন পথটি সঠিক, এবং কার কথা বিশ্বাস করে তিনি তার মনকে সেই পথে স্থির করবেন?

তৃতীয় স্তবক: ব্রহ্মজ্ঞান ও দরবেশের অনুসন্ধান

"ব্রহ্মজ্ঞানীখ্রিস্টানেরানাম ব্রহ্মসারবলেন তারাআবার দরবেশেকয় বস্তু কোথায়দেখ না রে ৼ"

  • ব্রহ্মজ্ঞানী খ্রিস্টানেরা: ব্রহ্মজ্ঞানী (ঈশ্বর সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন) খ্রিস্টানেরা
  • নাম ব্রহ্মসার: ব্রহ্মসার (ব্রহ্মের সারাংশ) বলে তার (ঈশ্বরকে) নাম দেয়
  • বলেন তারা: তারা তাই বলেন
  • আবার দরবেশে: আবার দরবেশেরা (সুফি সাধকেরা)
  • কয় বস্তু কোথায়: বলেন, বস্তু (পরম সত্তা) কোথায়, তা
  • দেখ না রে: দেখে নাও। মূলভাব: লালন বিভিন্ন ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব তুলে ধরছেন। খ্রিস্টানরা ঈশ্বরকে নাম দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন, আর দরবেশরা বলেন সেই বস্তু (সত্তা) কে নিজের মধ্যেই খুঁজে নিতে

চতুর্থ স্তবক: গুরুতত্ত্ব ও সাধকের নিজস্বতা

"গুরুতত্ত্ববিধি শোনা যায়তাও তো দেখিএকরূপ সে নয়লালন বলে যেযা বোঝেতাই করে ৼ"

  • গুরুতত্ত্ব বিধি: গুরুতত্ত্বের (গুরুর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান) বিধি (নিয়ম বা পদ্ধতি)
  • শোনা যায়: (সাধারণত) শোনা যায়
  • তাও তো দেখি: কিন্তু তাও তো আমি দেখি
  • একরূপ সে নয়: তা একরূপ (একই রকম) নয়
  • লালন বলে: লালন বলেন
  • যে যা বোঝে: যে ব্যক্তি যা বোঝে
  • তাই করে: সে তাই করে (অনুশীলন করে)। মূলভাব: লালন উপলব্ধি করছেন যে, গুরুতত্ত্বের নিয়মগুলোও সবার কাছে একরকম নয়। তাই তিনি বলছেন, মানুষ নিজের উপলব্ধি অনুযায়ীই পথ বেছে নেয়

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির পরম সত্তার দুর্লভতা এবং বিভিন্ন সাধন পথের বহুরূপতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রচলিত ধর্ম ও সাধনাগুলো বিভিন্ন দিকে পরিচালিত করে, যার ফলে একজন সাধকের পক্ষে সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। এমনকি গুরুতত্ত্বের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে। তাই তিনি আক্ষেপ করে বলছেন যে, মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের জ্ঞান ও উপলব্ধি অনুযায়ীই পথ বেছে নেয়, যা অনেক সময় ভুল হতে পারে। এটি লালনের আধ্যাত্মিক পথের জটিলতা ও মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক দার্শনিক ভাবনা।


Powered by Blogger.