আমি কি সাধনে পাই গো তারে
(৮১)
আমি কি সাধনে
পাই গো তারে।
ওসে ব্রহ্মা
বিষ্ণু ধ্যানে
পায় না যারে
ৼ
স্বর্ণ শিখর
যার নির্জন গোফা
স্বরূপে সেহি
চাঁদের আভা
আভা ধরতে চায়,
হাতে নাহি পাই
কিরূপে সেরূপ
যায় গো সরে ৼ
পড়ে শাস্ত্র-ভাষ
কেহ কেহ কয়
পঞ্চতত্ত্ব
হলে সেই তারে পায়
ওসে পঞ্চতত্ত্বের
ঘর, সেও তো অন্ধকার
নিরপেক্ষ রয়
দেখ বিচারে ৼ
গুরুপদে আজ
হইত মরণ
তবে বুঝি সফল
হইত জনম
ভেবে লালন কহে
ওরে মন
আমার ভাগ্যে
তাও ঘটলো না-রে ৼ
প্রথম
স্তবক: সাধনার প্রশ্ন ও আরাধ্যের দুর্লভতা
"আমি কি সাধনে পাই গো তারে। ওসে ব্রহ্মা বিষ্ণু
ধ্যানে পায় না যারেৼ"
- আমি কি সাধনে: আমি
কোন সাধনায় (আধ্যাত্মিক অনুশীলন)
- পাই গো তারে: তাকে
(পরম সত্তাকে) পাব?
- ওসে ব্রহ্মা বিষ্ণু: ব্রহ্মা ও বিষ্ণু (হিন্দু ধর্মের প্রধান দেবতা)।
- ধ্যানে পায় না যারে: ধ্যান (গভীর ধ্যান) করেও যাঁকে পান না। মূলভাব: লালন
প্রশ্ন করছেন, যদি ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মতো
দেবতারাও ধ্যান করে সেই পরম সত্তাকে না পান, তবে তার মতো একজন সাধারণ মানুষ কোন সাধনার মাধ্যমে তাঁকে পাবে?
দ্বিতীয়
স্তবক: স্বর্ণ শিখর ও চাঁদের আভা
"স্বর্ণ শিখর যার নির্জন গোফা স্বরূপে সেহি চাঁদের
আভা আভা ধরতে চায়, হাতে নাহি পাই কিরূপে সেরূপ যায় গো সরে ৼ"
- স্বর্ণ শিখর: স্বর্ণ
শিখর (সোনার চূড়া, যা উচ্চ আধ্যাত্মিক স্থানের প্রতীক)।
- যার নির্জন গোফা: যার নির্জন (জনমানবশূন্য) গোফা (গুহা)। এটি পরম সত্তার নির্জন বা একাকী অবস্থানকে বোঝায়।
- স্বরূপে সেহি: স্বরূপে (প্রকৃত রূপে) তিনি।
- চাঁদের আভা: চাঁদের
আভা (চাঁদের মতো স্নিগ্ধ জ্যোতি) রূপ।
- আভা ধরতে চায়: সেই
আভা (জ্যোতি) ধরতে চাই (লাভ করতে চাই)।
- হাতে নাহি পাই: কিন্তু
হাতে পাই না।
- কিরূপে সেরূপ: কীভাবে
সেই রূপ।
- যায় গো সরে: সরে
যায়? মূলভাব: পরম সত্তার নির্জন ও জ্যোতির্ময় রূপকে তিনি
উপলব্ধি করতে চান, কিন্তু সেই জ্যোতি অধরা।
তিনি আক্ষেপ করছেন, কেন সেই রূপ ধরাছোঁয়ার
বাইরে থাকে।
তৃতীয়
স্তবক: পঞ্চতত্ত্ব ও নিরপেক্ষে অবস্থান
"পড়ে শাস্ত্র-ভাষ কেহ কেহ
কয় পঞ্চতত্ত্ব হলে সেই তারে পায় ওসে পঞ্চতত্ত্বের ঘর, সেও তো অন্ধকার নিরপেক্ষ
রয় দেখ বিচারে ৼ"
- পড়ে শাস্ত্র-ভাষ: শাস্ত্র-ভাষ (শাস্ত্রের ভাষা) পড়ে।
- কেহ কেহ কয়: কেউ
কেউ বলে।
- পঞ্চতত্ত্ব হলে: পঞ্চতত্ত্বের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম – মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ) অধিকারী হলে।
- সেই তারে পায়: সেই
ব্যক্তি তাঁকে পায়।
- ওসে পঞ্চতত্ত্বের ঘর: সেই পঞ্চতত্ত্বের ঘর (মানবদেহ) তাও।
- সেও তো অন্ধকার: অন্ধকার (অজ্ঞানে আচ্ছন্ন)।
- নিরপেক্ষ রয়: (পরম সত্তা) নিরপেক্ষ (আলাদা
বা নির্লিপ্ত) থাকেন।
- দেখ বিচারে: (তুমি) বিচার করে দেখো। মূলভাব: লালন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তিনি বলছেন, যদিও শাস্ত্র বলে পঞ্চতত্ত্বের সাধনা করলে পরম সত্তাকে পাওয়া যায়, কিন্তু মানবদেহ (পঞ্চতত্ত্বের ঘর) নিজেই অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তাই পরম
সত্তা এই দেহের প্রতি নির্লিপ্ত থাকেন।
চতুর্থ
স্তবক: গুরুপদে মরণ ও ভাগ্য
"গুরুপদে আজ হইত মরণ তবে বুঝি সফল হইত জনম ভেবে লালন কহে ওরে মন আমার ভাগ্যে তাও
ঘটলো না-রে ৼ"
- গুরুপদে আজ: গুরুপদে (গুরুর চরণে)।
- হইত মরণ: যদি মরণ (আত্মবিলীনতা
বা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সমর্পণ) হতো।
- তবে বুঝি সফল: তাহলে
হয়তো সফল।
- হইত জনম: জনম (জীবন) হতো।
- ভেবে লালন কহে: এই
কথা ভেবে লালন বলেন।
- ওরে মন: হে
মন।
- আমার ভাগ্যে: আমার ভাগ্যে।
- তাও ঘটলো না-রে: সেই
মুরুর চরণে আত্মসমর্পণও ঘটলো না। মূলভাব: লালন
উপলব্ধি করছেন যে, জীবনের সার্থকতা কেবল গুরুর
কাছে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করার মধ্যে। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করছেন যে, তাঁর ভাগ্যে সেই আত্মনিবেদনটুকুও ঘটল না।
মূল
বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির পরম সত্তাকে লাভ করার
দুর্লভতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি প্রচলিত
শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও পঞ্চতত্ত্বের সাধনাকে অসম্পূর্ণ মনে করেন, কারণ মন ও দেহ নিজেই অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন। তাঁর মতে, একমাত্র পথ হলো গুরুর
চরণে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করা ('গুরুপদে
মরণ')। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করছেন যে, তাঁর দুর্ভাগ্য এমন যে এই সহজ পথটিও তিনি ধরতে পারছেন না। এটি একজন সাধকের
গভীর হতাশা ও অসহায়ত্বের এক করুণ প্রকাশ।