cover

cover

আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধ হয়

 


(৮০)

আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধ হয়।

আমি কথার অর্থ ভারি

আমাতে আর আমি নাই

 

অনন্ত শহর বাজারে

আমি আমি শব্দ করে

আমার আমি চিনতে নারে

বেদ পড়ি পাগলের প্রায়

 

মনছুর হাল্লাজ ফকির সেত

বলেছিল আমি সত্য

সই পলো সাঁইর আইন মত

শরায় কি তার মর্ম পায়

 

কুমবে এজনি কুমবে এজনিল্লা

সাঁইর হুকুমে দুই আমি হিল্লা

লালন বলে এ ভেদ খোলা

আছেরে মুর্শিদের ঠাঁই


প্রথম স্তবক: 'আমি' সত্তা ও সাধনার সিদ্ধি

"আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধ হয়। আমি কথার অর্থ ভারি আমাতে আর আমি নাই ৼ"

  • আমি কি তাই: আমি কে বা কী, তা
  • জানলে সাধন সিদ্ধ হয়: জানলে বা চিনতে পারলে সাধন (আধ্যাত্মিক সাধনা) সিদ্ধ (সফল) হয়
  • আমি কথার অর্থ ভারি: 'আমি' শব্দটির অর্থ খুবই ভারি (গুরুত্বপূর্ণ বা গভীর)
  • আমাতে আর আমি নাই: (কিন্তু) আমাতে (আমার মধ্যে) আর সেই 'আমি' (প্রকৃত আত্মা বা সত্তা) নেই। মূলভাব: লালন বলছেন, নিজের প্রকৃত 'আমি' কে, তা চিনতে পারলেই সাধনা সফল হয়। কিন্তু তিনি অনুভব করেন যে, তার মধ্যে সেই প্রকৃত 'আমি' হারিয়ে গেছে, তাই সাধনা সফল হচ্ছে না

দ্বিতীয় স্তবক: 'আমি আমি' শব্দ ও অজ্ঞানতা

"অনন্ত শহর বাজারে আমি আমি শব্দ করে আমার আমি চিনতে নারে বেদ পড়ি পাগলের প্রায় ৼ"

  • অনন্ত শহর বাজারে: এই অনন্ত (সীমাহীন) শহর বাজারে (জাগতিক কোলাহলে বা জীবনের পথে)
  • আমি আমি শব্দ করে: সবাই 'আমি' 'আমি' শব্দ করে (অর্থাৎ, নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করে)
  • আমার আমি চিনতে নারে: কিন্তু নিজের 'আমি' (প্রকৃত সত্তাকে) চিনতে পারে না
  • বেদ পড়ি: (ফলে) বেদ (ধর্মগ্রন্থ) পড়লেও
  • পাগলের প্রায়: পাগলের মতো (অর্থহীনভাবে) শোনায়। মূলভাব: মানুষ সারা জীবন নিজের অস্তিত্ব জাহির করলেও নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে না। ফলে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলেও তার কোনো অর্থ বোঝা যায় না, যা এক ধরনের পাগলামি

তৃতীয় স্তবক: মনসুর হাল্লাজ ও শরিয়তের সীমাবদ্ধতা

"মনছুর হাল্লাজ ফকির সেত বলেছিল আমি সত্য সই পলো সাঁইর আইন মত শরায় কি তার মর্ম পায় ৼ"

  • মনছুর হাল্লাজ: সুফি সাধক মনসুর হাল্লাজ
  • ফকির সেত: সেই ফকির (সাধক)
  • বলেছিল আমি সত্য: তিনি বলেছিলেন 'আমি সত্য' (আনাল হক বা 'আমিই সত্য')
  • সই পলো: তিনি সই পলো (ফাঁসিতে ঝুলেছেন বা শহীদ হয়েছেন)
  • সাঁইর আইন মত: সাঁই (আল্লাহ) এর আইন মত (প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী)
  • শরায় কি তার মর্ম পায়: শরা (শরিয়ত বা প্রচলিত ধর্মীয় বিধান) কি তার মর্ম (গভীর অর্থ) বুঝতে পারে? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, পারে না)। মূলভাব: মনসুর হাল্লাজ 'আনাল হক' বলে যে গভীর সত্যের কথা বলেছিলেন, প্রচলিত ধর্মীয় বিধান তা বুঝতে পারেনি এবং তাঁকে হত্যা করেছিল। এই গভীর তত্ত্ব শরিয়তের ঊর্ধ্বে

চতুর্থ স্তবক: দুই 'আমি' ও মুর্শিদের ভেদ

"কুমবে এজনি কুমবে এজনিল্লা সাঁইর হুকুমে দুই আমি হিল্লা লালন বলে এ ভেদ খোলা আছেরে মুর্শিদের ঠাঁই ৼ"

  • কুমবে এজনি: আরবি বাক্য 'কুমবে এজনি' যার অর্থ হলো 'আমি একা ছিলাম' (আল্লাহর একত্বের প্রতীক)
  • কুমবে এজনিল্লা: এবং 'কুমবে এজনিল্লা' (আমিই এক, যখন আর কেউ ছিল না)
  • সাঁইর হুকুমে: সাঁই (স্রষ্টা) এর হুকুমে (আদেশে)
  • দুই আমি হিল্লা: সেই এক 'আমি' থেকে দুই আমি (পরমাত্মা ও জীবাত্মা) পৃথক হলো
  • লালন বলে এ ভেদ খোলা: লালন বলেন, এই ভেদ (রহস্য) খোলা (উন্মোচন)
  • আছেরে মুর্শিদের ঠাঁই: মুর্শিদের (গুরুর) ঠাঁই (স্থানে বা কাছে) আছে। মূলভাব: সৃষ্টির শুরুতে পরম সত্তা একাই ছিলেন। তাঁর আদেশে সেই এক 'আমি' দুটি পৃথক 'আমি'তে (পরমাত্মা ও জীবাত্মা) বিভক্ত হলো। এই গভীর রহস্য কেবল একজন প্রকৃত গুরুর কাছেই জানা সম্ভব

মূল বার্তা:

এই গানে লালন ফকির নিজের প্রকৃত সত্তা ('আমি') কে চেনার গুরুত্বকে সাধনার মূল হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন যে, বেদ পাঠ করেও এই রহস্য বোঝা যায় না। মনসুর হাল্লাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝান যে, এই তত্ত্ব প্রচলিত ধর্মের ধারণার চেয়ে গভীর। পরিশেষে, তিনি সেই 'এক আমি' থেকে 'দুই আমি' তে বিভক্ত হওয়ার রহস্য বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এই গভীর তত্ত্বের সমাধান কেবল একজন মুর্শিদের (গুরুর) কাছেই পাওয়া সম্ভব


Powered by Blogger.