আমি কার ছায়ায় দাঁড়াই বল।
(৮৩)
আমি কার ছায়ায়
দাঁড়াই বল।
হায় রে বিধি
মোর
কি ইহাই ছিল
ৼ
কালার রূপে
নয়ন দিয়ে
প্রেমানলে মলাম
জ্বলে
ওরে বিধি একি
হল আমার
কাঁদতে কাঁদতে
জনম গেল ৼ
জগতে হয় যত
ব্যাধি
নিদানে হয় তাহার
বিধি
আমার এ ব্যাধির
নাই
আরও ঔষধী
প্রাণের বন্ধু
কোথায় রইল ৼ
প্রাণের মানুষ
কোথায় লুকাইল
আর আমার লাগে
না ভাল
আমার দেহলতা
দিনে দিনে শুকাইল
ফকির লালন বলে
রাধার কপাল
ভাল ৼ
লালন ফকিরের এই গানটি মূলত 'বিরহ' পর্যায়ের। এখানে পরমাত্মা বা 'প্রাণের
মানুষ'কে না পাওয়ার যে যন্ত্রণা, তা এক
বিরহিণী নারী (প্রায়ই রাধা হিসেবে রূপায়িত) বা ব্যাকুল সাধকের জবানিতে উঠে এসেছে।
প্রথম স্তবক: আশ্রয়ের
অভাব ও নিয়তি
"আমি কার ছায়ায় দাঁড়াই
বল। হায় রে বিধি মোর কি ইহাই
ছিলৼ"
- কার
ছায়ায় দাঁড়াই: কার
আশ্রয়ে বা কার ছায়াতলে নিজেকে রক্ষা করব? (যখন
পরম সত্তা বা প্রিয়তম পাশে নেই)।
- বিধি: ভাগ্য বা বিধাতা।
- কি
ইহাই ছিল: আমার
কপালে কি এই কষ্টই লেখা ছিল?
সারমর্ম: এখানে সাধক বা ভক্ত তার একাকীত্ব এবং ভাগ্যের নিষ্ঠুরতার
কথা বলছেন। যখন প্রিয়তম পাশে নেই, তখন জগতটা ছায়াহীন
মরুভূমির মতো মনে হচ্ছে।
দ্বিতীয় স্তবক: রূপের
মোহ ও বিরহ অনল
"কালার রূপে নয়ন
দিয়ে প্রেমানলে মলাম জ্বলে ওরে বিধি একি হল আমার কাঁদতে কাঁদতে জনম গেল ৼ"
- কালার
রূপে: 'কালা' অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বা পরমাত্মার শ্যামল সুন্দর রূপ।
- নয়ন
দিয়ে: দৃষ্টি দিয়ে বা মজে গিয়ে।
- প্রেমানলে: প্রেমের আগুনে।
- জনম
গেল: সারাজীবন কেটে গেল।
সারমর্ম: ঈশ্বরের সৌন্দর্যে মজে গিয়ে সাধক এখন প্রেমের দহনে
পুড়ছেন। এই 'বিরহ অনল' বা প্রেমের আগুন তাকে শান্তি দিচ্ছে না, বরং
সারাজীবন শুধু চোখের জলই ঝরছে।
তৃতীয় স্তবক: দুরারোগ্য
ব্যাধি ও ওষুধের অভাব
"জগতে হয় যত ব্যাধি নিদানে হয় তাহার বিধি আমার এ ব্যাধির নাই আরও
ঔষধী প্রাণের বন্ধু কোথায় রইল ৼ"
- ব্যাধি: রোগ।
- নিদান: রোগের কারণ নির্ণয় বা প্রতিকার।
- ঔষধী: ওষুধ বা প্রতিকার।
- প্রাণের
বন্ধু: পরমাত্মা
বা মুর্শিদ।
সারমর্ম: পৃথিবীর শারীরিক সব রোগের চিকিৎসা আছে, কিন্তু এই যে মনের অসুখ—অর্থাৎ প্রিয়তমের থেকে দূরে থাকার বিরহ রোগ—এর কোনো ওষুধ নেই। একমাত্র 'প্রাণের বন্ধু'র দেখা পেলেই এই রোগ সারতে পারে।
চতুর্থ স্তবক: আত্মিক
ক্ষয় ও আক্ষেপ
"প্রাণের মানুষ কোথায়
লুকাইল আর আমার লাগে না ভাল আমার দেহলতা দিনে
দিনে শুকাইল ফকির লালন বলে রাধার কপাল ভাল ৼ"
- দেহলতা: লতার মতো কোমল শরীর।
- রাধার
কপাল ভাল: এখানে
লালন এক গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করছেন। পুরাণে রাধা কৃষ্ণকে পেয়েছিলেন বা অন্তত
তাঁর বিরহে অমর হয়ে আছেন, কিন্তু
লালন নিজেকে এতটাই অধম মনে করছেন যে তাঁর মনে হচ্ছে রাধার ভাগ্যও তাঁর চেয়ে
ঢের ভালো ছিল।
সারমর্ম: প্রাণের মানুষ লুকিয়ে থাকায় জগতের কোনো কিছুই আর ভালো
লাগছে না। বিরহ যন্ত্রণায় শরীর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। লালন আক্ষেপ করে বলছেন, তিনি রাধার মতো উচ্চস্তরের সাধকও হতে পারেননি।
মূল শিক্ষা
লালন এই গানে বুঝিয়েছেন যে, আধ্যাত্মিক প্রেম কেবল আনন্দ নয়, বরং তা
এক ভীষণ দহন। যার ভেতরে এই প্রেমের রোগ ধরে, তার
কাছে পার্থিব সুখ-শান্তি তুচ্ছ হয়ে যায়। সে কেবল তার সেই **'প্রাণের মানুষ'**কে খুঁজে পাওয়ার জন্য ছটফট করতে
থাকে।