আমি কোন সাধনে তারে পাই
(৮৪)
আমি কোন সাধনে
তারে পাই।
আমার জীবনেরও
জীবন সাঁই ৼ
শাক্তশৈব বৈরাগ্যের
ভাব
তাতে যদি হয়
চরণ লাভ
দয়াময় কেন সর্বদায়
বেদীভক্তি বলে
দোষিলেন তাই ৼ
সাধলে সিদ্ধির
ঘরে
শুনিলাম সেও
পায় না তারে
সাধুর যে মুক্তি
পেল সে ব্যক্তি
ঠকে যাবে অমনি
শুনিরে ভাই ৼ
গেল না রে মনের
ভ্রান্ত
পেলাম না সে
ভাবের অস্ত
তাই বলে মূঢ়
লালন ভবে এসে মন
কি করিতে এসে
কি করে যাই ৼ
লালন
সাঁইজির এই গানে ফুটে উঠেছে এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। এখানে তিনি প্রচলিত
শাস্ত্রীয় উপাসনা বা কঠোর বৈরাগ্যের চেয়েও মনের শুদ্ধতা এবং প্রকৃত 'ভাব'-এর ওপর জোর দিয়েছেন। আপনার জন্য গানটির শব্দার্থ ও ভাবার্থ নিচে সাজিয়ে
দেওয়া হলো:
স্তবকভিত্তিক
শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা
১.
প্রথম স্তবক: ব্যাকুলতা
"আমি কোন সাধনে তারে পাই। আমার জীবনেরও জীবন সাঁই ৼ"
- সাধন: আধ্যাত্মিক
অনুশীলন বা পদ্ধতি।
- তারে: পরমাত্মা
বা ঈশ্বরকে।
- জীবনেরও জীবন: প্রাণের
প্রাণ (যিনি আমার অস্তিত্বের মূলে)।
- সাঁই: প্রভু
বা পরম সত্তা।
- সহজ অর্থ: লালন
আক্ষেপ করছেন, কোন উপায়ে আমি সেই প্রভুকে
পাবো, যিনি আমার প্রাণের সঞ্চার
করেন?
২.
দ্বিতীয় স্তবক: শাস্ত্রীয় আচারের সীমাবদ্ধতা
"শাক্তশৈব বৈরাগ্যের ভাব তাতে যদি হয় চরণ লাভ দয়াময় কেন সর্বদায় বেদীভক্তি
বলে দোষিলেন তাই ৼ"
- শাক্ত: দেবী
শক্তির উপাসক।
- শৈব: শিবের
উপাসক।
- বৈরাগ্য: সংসার
ত্যাগ বা সন্ন্যাস।
- চরণ লাভ: ঈশ্বরের
সান্নিধ্য পাওয়া।
- বেদীভক্তি: শাস্ত্রীয়
বিধি-বিধান বা আনুষ্ঠানিক উপাসনা (Ritualistic worship)।
- দোষিলেন: ভ্রান্ত
বা অসম্পূর্ণ বলে চিহ্নিত করা।
- সহজ অর্থ: যদি
কেবল শাক্ত, শৈব বা ঘরছাড়া সন্ন্যাসী
হলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যেত, তবে
কেন বিধাতা শুধু বাহ্যিক আচার-সর্বস্ব ভক্তিকে (বেদীভক্তি) নিরুৎসাহিত করেন? অর্থাৎ, অন্তরের টান ছাড়া কেবল
লেবাসে ঈশ্বর মেলে না।
৩.
তৃতীয় স্তবক: মুক্তি বনাম ভক্তি
"সাধলে সিদ্ধির ঘরে শুনিলাম সেও পায় না তারে সাধুর যে মুক্তি পেল সে ব্যক্তি
ঠকে যাবে অমনি শুনিরে ভাই ৼ"
- সিদ্ধির ঘর: কঠোর
তপের মাধ্যমে অর্জিত অলৌকিক ক্ষমতা বা সাফল্যের শিখর।
- মুক্তি: জন্ম-মৃত্যুর
চক্র থেকে নিষ্কৃতি।
- ঠকে যাবে: বঞ্চিত
হবে বা আসল জিনিস পাবে না।
- সহজ অর্থ: অনেকে
কঠোর সাধনায় 'সিদ্ধি' লাভ করে, কিন্তু তাতেও ঈশ্বরের দেখা
মেলে না। যারা কেবল নিজের 'মুক্তি' বা ব্যক্তিগত মোক্ষ চায়, তারা
আসলে প্রেমের প্রকৃত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় বা 'ঠকে' যায়।
৪.
চতুর্থ স্তবক: আত্ম-উপলব্ধি ও আক্ষেপ
"গেল না রে মনের ভ্রান্ত পেলাম না সে ভাবের অস্ত তাই বলে মূঢ় লালন ভবে এসে
মন কি করিতে এসে কি করে যাই ৼ"
- ভ্রান্ত: বিভ্রান্তি
বা ভুল ধারণা।
- ভাবের অস্ত: আধ্যাত্মিক
প্রেমের গভীরতা বা শেষ সীমা।
- মূঢ়: নির্বোধ
বা অজ্ঞ।
- ভবে: পৃথিবীতে।
- সহজ অর্থ: লালন
বলছেন, আমার মনের ধন্দ কাটল না, আমি সেই প্রেমের অতল রহস্য বুঝলাম না। আমি এই পৃথিবীতে কী এক মহৎ
উদ্দেশ্যে এসেছিলাম, আর কীসব তুচ্ছ কাজ করে
বিদায় নিচ্ছি!
গুরুত্বপূর্ণ
শব্দের সারসংক্ষেপ (Glossary)
|
শব্দ |
অর্থ |
|
সাঁই |
পরমাত্মা, বাউলদের আরাধ্য পরম গুরু। |
|
বেদীভক্তি |
শাস্ত্র
বা নিয়মের বাঁধাধরা উপাসনা (বাহ্যিক আড়ম্বর)। |
|
সিদ্ধি |
সাধনার
মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা। |
|
মূর্ত/মূঢ় |
বোধহীন
বা বোকা (লালন বিনয় করে নিজেকে বলছেন)। |
|
ভাবের অস্ত |
দিব্য
অনুভূতির গভীরতম উপলব্ধি। |
সারকথা
লালন
এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, ঈশ্বর কোনো ধর্মীয় তকমা (শাক্ত, শৈব) বা শুকনো বৈরাগ্যে ধরা দেন না। এমনকি ব্যক্তিগত মুক্তির লোভও ঈশ্বর
প্রেমের পথে বাধা হতে পারে। তিনি কেবল সহজ প্রেমের মানুষ। নিজেকে 'মূঢ়' বলার মাধ্যমে লালন আমাদের
শেখাচ্ছেন যে, জাগতিক পান্ডিত্য দিয়ে তাকে চেনা
অসম্ভব।