আমি বলি তোরে মন গুরুর চরণ
(৮৫)
আমি বলি তোরে
মন গুরুর চরণ
করবে ভজন।
গুরুর চরণ পরম
রতন
করবে সাধন ৼ
মায়াতে মত্ত
হলে গুরুর চরণ না চিনিলে
সত্য পথ হারাইলে
খোয়ালে গুরুবস্তু
ধন ৼ
ত্রিপিনের ত্রি-ধারে
মীনরূপে সাঁই
বিরাজ করে
কেমন করে ধরবে
তারে
মন রে অবুঝ
মন ৼ
মহতের সঙ্গ
ধর
কামের ঘরে কপাট
মার
লালন বলে সে
রূপ দরশনে
পারিরে পরশ
রতন ৼ
লালন
সাঁইজির এই গানটি গুরুতত্ত্ব এবং
সাধনতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
এখানে তিনি মনকে গুরুর চরণে সঁপে দেওয়ার এবং কামনাবাসনা ত্যাগ করে সত্য উপলব্ধির
কথা বলেছেন। আপনার জন্য এর শব্দার্থ ও মূলভাব নিচে সহজভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো:
স্তবকভিত্তিক
ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ
১.
প্রথম স্তবক: গুরুর গুরুত্ব
"আমি বলি তোরে মন গুরুর চরণ করবে ভজন। গুরুর চরণ পরম রতন করবে সাধন ৼ"
- ভজন: আরাধনা
বা সেবা করা।
- পরম রতন: শ্রেষ্ঠ
মণি বা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
- সাধন: চর্চা
বা আধ্যাত্মিক অনুশীলন।
- সারকথা: লালন
মনকে বলছেন যে, গুরুর নির্দেশ বা তাঁর
কৃপাকেই জীবনের মূল অবলম্বন করতে হবে। কারণ গুরুর জ্ঞানই হলো জগতের সবচেয়ে বড়
সম্পদ।
২.
দ্বিতীয় স্তবক: মায়ার জাল ও সত্য পথ
"মায়াতে মত্ত হলে গুরুর চরণ না চিনিলে সত্য পথ হারাইলে খোয়ালে গুরুবস্তু ধন
ৼ"
- মায়া: জাগতিক
মোহ বা মরীচিকা।
- মত্ত: বিভোর
বা আত্মহারা হওয়া।
- খোয়ালে: হারিয়ে
ফেলা।
- গুরুবস্তু ধন: গুরুর
দেওয়া অমূল্য জ্ঞান বা আত্মতত্ত্ব।
- সারকথা: মানুষ
যখন দুনিয়াবি লোভ-লালসায় অন্ধ হয়ে যায়, তখন
সে সঠিক পথটি আর চিনতে পারে না। ফলে গুরুর দেওয়া মহামূল্যবান আধ্যাত্মিক
শিক্ষা সে চিরতরে হারিয়ে ফেলে।
৩.
তৃতীয় স্তবক: দেহের গূঢ় রহস্য (যোগতত্ত্ব)
"ত্রিপিনের ত্রি-ধারে মীনরূপে সাঁই বিরাজ করে কেমন করে ধরবে তারে মন রে অবুঝ
মন ৼ"
- ত্রিপিন: ত্রিবেণী
(ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামক
তিনটি নাড়ীর মিলনস্থল)। দেহসাধনায় এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র আধ্যাত্মিক
কেন্দ্র।
- মীনরূপে: মাছের
মতো। যেমন মাছকে জল থেকে ধরা কঠিন, তেমনি
চঞ্চল মনের ভেতরে সত্যকে ধরাও কঠিন।
- সাঁই: পরমেশ্বর
বা পরম সত্তা।
- সারকথা: মানবদেহের
আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে ঈশ্বর এক রহস্যময় রূপে বিরাজ করেন। গুরু ছাড়া বা মনের
অস্থিরতা না কমিয়ে সেই পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা অসম্ভব।
৪.
চতুর্থ স্তবক: কুপ্রবৃত্তি দমন ও প্রাপ্তি
"মহতের সঙ্গ ধর কামের ঘরে কপাট মার লালন বলে সে রূপ দরশনে পারিরে পরশ রতন
ৼ"
- মহতের সঙ্গ: সাধু
বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাহচর্য (সৎসঙ্গ)।
- কামের ঘরে কপাট মার: মনের কাম-বাসনা বা কুপ্রবৃত্তির পথ বন্ধ করা।
- পরশ রতন: স্পর্শমণি
(যা স্পর্শ করলে লোহা সোনা হয়ে যায়)। এখানে আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক।
- সারকথা: লালন
বলছেন, যদি সত্যকে পেতে হয় তবে
সৎসঙ্গে থাকতে হবে এবং রিপু বা কামনা-বাসনাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তবেই সেই রূপ দর্শন হবে যা মানুষকে সাধারণ থেকে মহামানবে পরিণত করে।
গুরুত্বপূর্ণ
শব্দকোষ (Quick Glossary)
|
শব্দ |
অর্থ |
|
ভজন |
ভক্তি
ও অনুরাগের সাথে উপাসনা। |
|
ত্রিপিন |
ত্রিবেণী; যোগশাস্ত্র অনুযায়ী দেহের তিনটি প্রধান প্রাণপ্রবাহের সন্ধিস্থল। |
|
মীন |
মাছ; এখানে চঞ্চল কিন্তু দিব্য প্রাণের প্রতীক। |
|
কপাট |
দরজা। |
|
পরশ রতন |
অমূল্য
সম্পদ যা মানুষকে বদলে দেয়। |
মূল
শিক্ষা
লালন এই
গানে আমাদের বলছেন যে, কামনা-বাসনার দরজা বন্ধ করে এবং
গুরুর নির্দেশ মেনে সৎপথে চললে মানুষের
ভেতরে যে ঈশ্বর (সাঁই) বিরাজ করছেন, তাঁকে
খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেবল বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, অন্তরের
শুদ্ধিই হলো আসল পথ।