cover

cover

আমি কোথায় ছিলাম আবার কোথায় এলাম ভাবি তাই

 


(৮৬)

আমি কোথায় ছিলাম

আবার কোথায় এলাম ভাবি তাই।

একবার এসে এই ফল আমার

জানি আবার ফিরে কোথা যাই

 

বেদ-পরাণে শুনি সদায়

কীর্তিকর্মা আছে একজন জগৎময়

আমি না জানি তার বাড়ি কোথায়

আমি কি সাধনে তারে পাই

 

যাদের সঙ্গে করি কারবার

তারাই সব বিবাগী আবার হলো রে আমার

লুটল রে এই ধনীর ভান্ডার

আমায় ঘিরে ঊনপঞ্চাশ বাই

 

কেবা আমার আমি বা কার

মিছে ধন্ধবাজি এ ভবসংসার

অধীন লালন বলে হইলাম অপার

আমার সাথের সাথী কেহ নাই


লালন সাঁইজির এই গানটি আত্মতত্ত্ব এবং মানবজীবনের নশ্বরতা নিয়ে এক গভীর হাহাকার। মানুষ কোথা থেকে এলো, কোথায় যাবে এবং এই মায়াময় পৃথিবীতে সে আসলে কতটা একাসেই সত্যই এখানে ফুটে উঠেছে। আপনার জন্য গানটির শব্দার্থ ও গূঢ় অর্থ নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো:


স্তবকভিত্তিক ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ

১. প্রথম স্তবক: অস্তিত্বের জিজ্ঞাসা

"আমি কোথায় ছিলাম আবার কোথায় এলাম ভাবি তাই। একবার এসে এই ফল আমার জানি আবার ফিরে কোথা যাই ৼ"

  • কোথায় ছিলাম: জন্মের আগে আত্মার অবস্থান
  • কোথায় এলাম: এই মর্ত্যলোক বা পৃথিবী
  • এই ফল: এই মানবজীবন বা বর্তমান অবস্থা
  • সারমর্ম: লালন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করছেন। তিনি বুঝতে পারছেন না জন্মের আগে তিনি কোথায় ছিলেন এবং মৃত্যুর পর তাঁর গন্তব্য ঠিক কোথায়। এই অনিশ্চয়তা তাঁকে ভাবিয়ে তুলছে

২. দ্বিতীয় স্তবক: অজানার সন্ধান

"বেদ-পরাণে শুনি সদায় কীর্তিকর্মা আছে একজন জগৎময়। আমি না জানি তার বাড়ি কোথায় আমি কি সাধনে তারে পাই ৼ"

  • বেদ-পরাণে: ধর্মশাস্ত্রে (বেদ ও পুরাণ)
  • কীর্তিকর্মা: যিনি সকল কর্মের কর্তা, অর্থাৎ ঈশ্বর বা পরমাত্মা
  • বাড়ি: তাঁর অবস্থান বা স্বরূপ
  • সাধন: উপাসনা বা আধ্যাত্মিক চর্চা
  • সারমর্ম: শাস্ত্রে ঈশ্বরের অনেক মহিমার কথা শোনা যায়, কিন্তু লালন আক্ষেপ করছেন যে তিনি তাঁর দেখা পাচ্ছেন না। কোন পথে চললে বা কী উপায়ে সেই অজানাকে চেনা যাবে, তা নিয়ে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত

৩. তৃতীয় স্তবক: দেহের বিনাশ ও রিপুর তাড়না

"যাদের সঙ্গে করি কারবার তারাই সব বিবাগী আবার হলো রে আমার। লুটল রে এই ধনীর ভান্ডার আমায় ঘিরে ঊনপঞ্চাশ বাই ৼ"

  • কারবার: মেলামেশা বা সম্পর্ক (পরিবার বা শরীরের ইন্দ্রিয়)
  • বিবাগী: বিবাগী হওয়া বা সঙ্গ ত্যাগ করা
  • ধনীর ভাণ্ডার: মানুষের অমূল্য শরীর বা আত্মিক শক্তি
  • ঊনপঞ্চাশ বাই: বাউল ও যোগতত্ত্ব মতে, মানবদেহে ৪৯ প্রকার বায়ু বা মানসিক অস্থিরতা কাজ করে। এগুলো মানুষকে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করে
  • সারমর্ম: লালন বলছেন, যাদের নিয়ে আমরা সংসার করি (স্বজন বা দেহের ইন্দ্রিয়), তারা কেউই চিরস্থায়ী নয়। শেষ সময়ে সবাই সঙ্গ ত্যাগ করে। আর নানা মানসিক অস্থিরতা (বায়ু) মানুষের জীবনের আসল সম্পদ লুটে নেয়

৪. চতুর্থ স্তবক: মায়ার সংসার ও একাকীত্ব

"কেবা আমার আমি বা কার মিছে ধন্ধবাজি এ ভবসংসার। অধীন লালন বলে হইলাম অপার আমার সাথের সাথী কেহ নাই ৼ"

  • ধন্ধবাজি: ধাঁধা, জাদুকরী মায়া বা ঘোর
  • ভবসংসার: এই মায়াময় পৃথিবী
  • অপার: কুল-কিনারা হারানো বা পার হওয়ার অযোগ্য অবস্থা
  • সারমর্ম: এই পৃথিবী এক মস্ত বড় ধাঁধা। এখানে কেউ কারো নয়। লালন নিজেকে অত্যন্ত অসহায় মনে করছেন এবং বলছেন যে, এই জীবন-নদী পার হওয়ার জন্য তাঁর পাশে পরম বন্ধু (সাঁই) ছাড়া আর কেউ নেই

গুরুত্বপূর্ণ শব্দকোষ (Quick Glossary)


মূল দর্শন

এই গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এই পৃথিবীতে অতিথি মাত্র। আমাদের আত্মীয়-স্বজন বা আমাদের শরীরকিছুই চিরস্থায়ী নয়। লালন এই 'ঊনপঞ্চাশ বাই' বা মনের অস্থিরতা কাটিয়ে নিজের আসল 'আমি'কে খুঁজে পাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন


Powered by Blogger.