আমি ওই চরণে দাসের যোগ্য নই
(৮৭)
আমি ওই চরণে
দাসের যোগ্য নই।
নইলে মোর দশা
কি এমন হয় ৼ
ভাব জানি নে
প্রেম জানি নে
দাসী হতে চাই
চরণে
ভাব দিয়ে ভাব
নিলে মনে
সেই সে রাঙা
চরণ পায় ৼ
নিজগুণে পদার
বিন্দু
চরণ দেন যদি
সাঁই দীনবন্ধু
তবে তুমি ভব
সিন্ধু
আর তো না দেখি
উপায় ৼ
অহল্যা পাষাণী
ছিল
প্রভুর চরণ
ধুলায় মানব হলো
লালন পথে পড়ে
রল
এবার যা করে
সাঁই দয়াময় ৼ
স্তবকভিত্তিক
ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ
১.
প্রথম স্তবক: নিজের অযোগ্যতা স্বীকার
"আমি ওই চরণে দাসের যোগ্য নই। নইলে মোর দশা কি এমন হয় ৼ"
- চরণ: পা
বা পাদপদ্ম (এখানে ঈশ্বর বা গুরুর আশ্রয়)।
- যোগ্য: উপযুক্ত।
- দশা: অবস্থা
বা পরিস্থিতি।
- সারকথা: লালন
বলছেন, যদি আমি প্রকৃতপক্ষে তাঁর
চরণে দাস হওয়ার যোগ্য হতাম, তবে
আমার আধ্যাত্মিক অবস্থা আজ এত শোচনীয় হতো না। আমার বর্তমান দুর্দশাই প্রমাণ
করে যে আমি এখনো তাঁর কৃপা পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠিনি।
২.
দ্বিতীয় স্তবক: ভাবের অভাব
"ভাব জানি নে প্রেম জানি নে দাসী হতে চাই চরণে। ভাব দিয়ে ভাব নিলে মনে সেই
সে রাঙা চরণ পায় ৼ"
- ভাব: আধ্যাত্মিক
অনুভূতি বা ভক্তি।
- রাঙা চরণ: লাল
রঙের পা (পবিত্র ও সুন্দর পাদপদ্ম)।
- ভাব দিয়ে ভাব নেওয়া: অন্তরের গভীর ভক্তির বিনিময়ে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা।
- সারকথা: তাঁর
চরণে স্থান পেতে হলে অন্তরে গভীর প্রেম ও 'ভাব' থাকতে হয়। কিন্তু লালনের
আক্ষেপ—তাঁর অন্তরে সেই প্রেম নেই।
তিনি কেবল মুখে দাসী হতে চাইছেন, কিন্তু
অন্তরের ভক্তি ছাড়া সেই পরম আশ্রয় পাওয়া অসম্ভব।
৩.
তৃতীয় স্তবক: কৃপার প্রার্থনা
"নিজগুণে পদার বিন্দু চরণ দেন যদি সাঁই দীনবন্ধু। তবে তুমি ভব সিন্ধু আর তো
না দেখি উপায় ৼ"
- নিজগুণে: নিজের
দয়ায় বা মহত্ত্বের কারণে।
- পদার বিন্দু: চরণের
এক কণা ধূলি বা সামান্য কৃপা।
- সাঁই দীনবন্ধু: প্রভু, যিনি গরিবের বন্ধু।
- ভব সিন্ধু: এই
মায়াময় জগৎ রূপ সমুদ্র।
- সারকথা: এই
কঠিন পৃথিবী বা জন্ম-মৃত্যুর সাগর পার হওয়ার কোনো ক্ষমতা লালনের নেই। যদি
প্রভু দয়া করে তাঁর চরণের সামান্য ধূলিকণাটুকু দান করেন, তবেই মুক্তি সম্ভব।
৪.
চতুর্থ স্তবক: অহল্যার উদাহরণ ও আশা
"অহল্যা পাষাণী ছিল প্রভুর চরণ ধুলায় মানব হলো। লালন পথে পড়ে রল এবার যা করে
সাঁই দয়াময় ৼ"
- অহল্যা: রামায়ণের
একটি চরিত্র, যিনি অভিশাপে পাথর (পাষাণী)
হয়ে গিয়েছিলেন এবং শ্রীরামের পায়ের স্পর্শে পুনরায় মানুষ হন।
- পাষাণী: পাথরের
নারী।
- পথে পড়ে রল: সম্পূর্ণ
অসহায়ভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
- সারকথা: লালন
বলছেন, যদি জড় পাথর প্রভুর চরণের
স্পর্শে জীবন ফিরে পেতে পারে, তবে
তিনিও অযোগ্য হয়েও আশা ছাড়ছেন না। তিনি নিজেকে পথের ধুলোয় সঁপে দিয়েছেন; এখন তাঁর যা কিছু ভালো-মন্দ, তা
দয়াময় সাঁইয়ের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
গুরুত্বপূর্ণ
শব্দকোষ (Quick Glossary)
মূল
দর্শন
এই গানে
লালন আমাদের শেখাচ্ছেন যে, অহংকার ত্যাগ করে নিজেকে শূন্য
করে দেওয়াই হলো স্রষ্টাকে পাওয়ার প্রথম ধাপ। যখন মানুষ বুঝতে পারে সে কিছুই না ('দাসের
যোগ্য নই'), তখনই পরম করুণাময়ের কৃপার দ্বার খুলে যায়। অহল্যার
উদাহরণটি দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ঈশ্বরের দয়ায় অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।